বুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 বুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বালু-পাথর উত্তোলন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গোয়াইনঘাটে জিরো টলারেন্স, ওসিকে ঘিরে অপপ্রচার

আইকন
স্টার সিলেট
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন
বালু-পাথর উত্তোলন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গোয়াইনঘাটে জিরো টলারেন্স, ওসিকে ঘিরে অপপ্রচার

স্টাফ রিপোর্টার:


সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন, নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ওমর ফারুক মোড়ল। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশি তৎপরতা জোরদার করার পাশাপাশি নৌপথে অবৈধ চাঁদাবাজি ও সীমান্তঘেঁষা এলাকায় পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


এদিকে পুলিশের অভিযান ও কঠোর অবস্থানের কারণে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষুব্ধ হয়ে ওসির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী, পুলিশ প্রশাসন ও অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। ওসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত চাঁদা দাবি ও অসাধু লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


দায়িত্ব গ্রহণের পর অপরাধ দমনে জোরালো তৎপরতা


স্থানীয় সূত্র ও প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ জুলাই রাতে গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. ওমর ফারুক মোড়ল। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ দমন, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষকে কার্যকর পুলিশি সেবা প্রদানের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।


৪ জুলাই গোয়াইনঘাট প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি মাদক ও চোরাচালান নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি থানাকে জনবান্ধব ও দালালমুক্ত হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় মাদক, চোরাচালান, নৌপথে অবৈধ অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে তারা জানান।


সালুটিকরে নৌপথে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক


নৌপথে অবৈধ চাঁদাবাজি প্রতিরোধে পুলিশের অভিযানের একটি ঘটনা ঘটে গত ১৯ জুন। প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালুটিকর এলাকায় বাল্কহেড ও কার্গোজাহাজ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের সময় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়।


শুক্রবার সকালে সালুটিকর ইউনিয়নের রানীগঞ্জ গ্রামসংলগ্ন সালুটিকর ব্রিজের নিচে সারি-গোয়াইন (চেঙ্গেরখাল) নদীতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে চাঁদাবাজির অভিযোগে একজনকে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় রশিদ বই ও নগদ টাকা উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।


নৌপথে চলাচলকারী বাল্কহেড ও কার্গোজাহাজের শ্রমিকদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র।


তবে আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালত ও তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।


বিছানাকান্দি-হাদারপাড়ে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে তৎপরতা


গোয়াইনঘাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা বিছানাকান্দি ও হাদারপাড়। এসব এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান ও নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মে জড়িত রয়েছে। অবৈধ উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের তৎপরতা জোরদার হলে সংশ্লিষ্টদের অবৈধ আয়ের পথ সংকুচিত হতে পারে বলে তারা মনে করেন।


স্থানীয় সচেতন মহলের কয়েকজনের দাবি, ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে পুলিশি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবেশ রক্ষা ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন প্রতিরোধে প্রশাসনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।


তবে বালু-পাথর উত্তোলনসংক্রান্ত নির্দিষ্ট অভিযান, জব্দের পরিমাণ, জরিমানা কিংবা মামলার সংখ্যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হালনাগাদ তথ্য ছাড়া সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান উল্লেখ করা যাচ্ছে না।


অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য নিয়ে আলোচনা


সম্প্রতি কিছু সংবাদমাধ্যমে গোয়াইনঘাট থানার ওসির বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও অসাধু লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল।


অন্যদিকে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


পুলিশের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ অর্থ আদায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে পুলিশি কার্যক্রম নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


সিলেট রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত


প্রকাশিত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬ মাসের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মামলা নিষ্পত্তি, নিয়মিত মামলায় আসামি গ্রেপ্তার এবং মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মো. ওমর ফারুক মোড়ল সিলেট রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নির্বাচিত হন।


৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তাকে সম্মাননা স্মারক ও সনদ প্রদান করা হয় বলে সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সম্মাননার নির্দিষ্ট শ্রেণি, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও সরকারি নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।


এ সম্মাননার বিষয়ে ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল বলেন, এ অর্জন শুধু তার একার নয়; গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের সব কর্মকর্তা ও সদস্য এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার ফল।


এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ওমর ফারুক মোড়ল অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন,


“অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান জিরো টলারেন্স। গোয়াইনঘাট থানায় যোগদানের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করে যাচ্ছি। অভিযান ও আইনি ব্যবস্থার কারণে যাদের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে, তারাই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার বা পুলিশের নাম ভাঙিয়ে কোথাও চাঁদা তোলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ভিত্তিহীন অভিযোগে পুলিশি তৎপরতা থেমে যাবে না।”


তিনি আরও বলেন, নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।


স্থানীয়দের প্রত্যাশা


গোয়াইনঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা আরও কার্যকর হবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।


তাদের মতে, সীমান্তবর্তী এ উপজেলায় অপরাধ দমন ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা।


আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নৌপথে অবৈধ অর্থ আদায়, চোরাচালান এবং পরিবেশবিনাশী বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে গোয়াইনঘাটে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।