সিলেট গ্যাস ফিল্ডের টেন্ডারে বাধার অভিযোগ, তদন্ত ও সিসিটিভি যাচাইয়ের দাবি
নিজস্ব সংবাদদাতা,জৈন্তাপুট- সিলেট:
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) বিভিন্ন বিভাগ ও গ্যাস ফিল্ডের জন্য চালক ও জ্বালানিসহ ভাড়ায় গাড়ি সরবরাহের দরপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়ে দরপত্র জমা দিতে গিয়েও টেন্ডার বাক্সে কাগজপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন প্রায় ১২ জন ব্যবসায়ী।
অভিযোগকারী ব্যবসায়ীদের দাবি, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের প্রধান কার্যালয়ে টেন্ডার জমাদানের সময় স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে চাপ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় জৈন্তাপুর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহীন আলমসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীদের দরপত্র জমা দিতে বাধা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চারটি দরপত্র টেন্ডার বাক্সে জমা পড়ে।
তবে শাহীন আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অভিযোগটি “সম্পূর্ণ মিথ্যা”। তিনি জানান, তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং চারটি টেন্ডার জমা পড়েছে। অন্য ব্যবসায়ীরা কেন দরপত্র জমা দেননি, তা তিনি বলতে পারবেন না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য তারা সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের সার্ভিসেস ডিভিশনের নিরাপত্তা শাখা (ট্রান্সপোর্ট) এলাকায় উপস্থিত হন। সেখানে টেন্ডার বাক্সে দরপত্র জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাদের বাধা দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার জমা দিতে এসেছিলাম। কিন্তু ছাত্রদল নেতা শাহীন আলমসহ কয়েকজন আমাদের টেন্ডার জমা দিতে বাধা দেন। শেষ পর্যন্ত বিএনপি-ছাত্রদলের চারটি টেন্ডার জমা হয়েছে, আর আমাদের কাউকেই টেন্ডার জমা দিতে দেওয়া হয়নি।”
আরেক ব্যবসায়ী মোসায়িদ আলী বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও তাদের অনুসারী টেন্ডার এলাকায় অবস্থান নেওয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপ ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়।
স্থানীয় ও ব্যবসায়ী সূত্রের দাবি, টেন্ডার জমাদানের সময়ের আগে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের সিবিএ কার্যালয় এলাকায় জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রশিদ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহীন আলম, ফতেপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী ইলিয়াস, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি সোয়েব আহমদ এবং চিকনাগুল ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আদনান ছাব্বিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে তাদের উপস্থিতি দরপত্র জমাদানে বাধা দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
টেন্ডার জমাদানকে কেন্দ্র করে সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের সিবিএর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ‘সমঝোতার’ প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, “ঝামেলা করার দরকার নেই, আমরা সমঝোতা করে দেব।”
ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সমঝোতার প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক যোগ্য দরদাতাকে টেন্ডার বাক্সে দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
নজরুল ইসলাম বলেন, “আজ টেন্ডার জমা দিতে এসে অনেকেই টেন্ডার জমা দিতে পারেননি, এটি দুঃখজনক। এখানে স্থানীয় এলাকার কিছু ছেলে এসে টেন্ডার জমা দিতে ব্যবসায়ীদের বাধা দিয়েছে। তাই তারা টেন্ডার জমা দিতে পারেননি। চারটি টেন্ডার জমা পড়েছে। বাকিটা গ্যাস ফিল্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাই হবে।”
টেন্ডার বক্সে দায়িত্বে থাকা সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আজকের টেন্ডার জমাদানের পরিবেশটা মারমুখী ছিল। স্থানীয় এলাকার ১০/১২ জন এসে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের টেন্ডার জমা দিতে দেননি। চারটি টেন্ডার জমা পড়েছে। কিন্তু অন্যান্য ব্যবসায়ী সময়মতো এসেও স্থানীয় ছাত্রদল নেতাদের বাধার কারণে দরপত্র জমা দিতে পারেননি।”
তার এই বক্তব্যের ফলে দরপত্র জমাদানের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের দরপত্র-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই বিভিন্ন বিভাগ ও গ্যাস ফিল্ডের জন্য চালক ও জ্বালানি (POL)সহ ভাড়াভিত্তিক মাঝারি মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও পিকআপ সরবরাহের জন্য জাতীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ২৪ আগস্ট দরপত্রের সময়সূচি সংশোধন করা হয়।
চারটি প্যাকেজের মাধ্যমে মোট নয়টি যানবাহন ভাড়ায় নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মাঝারি মিনিবাস, পাঁচটি মাইক্রোবাস এবং একটি ডাবল কেবিন পিকআপ রয়েছে।
প্যাকেজ ‘ক’-এর আওতায় চিকনাগুলের প্রধান কার্যালয়ের জন্য একটি এবং হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডের জন্য দুটি—মোট তিনটি ৩৬ আসনের মাঝারি মিনিবাস নেওয়ার কথা রয়েছে। এ প্যাকেজে গত তিন বছরে সমমূল্যের সফলভাবে সম্পন্ন কাজের ন্যূনতম অভিজ্ঞতার অর্থমূল্য ৫০ লাখ টাকা।
প্যাকেজ ‘খ’-এর আওতায় প্রধান কার্যালয়ের জন্য কমপক্ষে সাত আসনের চারটি মাইক্রোবাস নেওয়া হবে। এ প্যাকেজে ন্যূনতম অভিজ্ঞতার অর্থমূল্য ৮৮ লাখ টাকা।
প্যাকেজ ‘গ’-এর আওতায় হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের জন্য কমপক্ষে ১১ আসনের একটি মাইক্রোবাস এবং প্যাকেজ ‘ঘ’-এর আওতায় রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডের জন্য পাঁচ আসনের একটি ডাবল কেবিন পিকআপ নেওয়ার কথা রয়েছে। এ দুটি প্যাকেজে ন্যূনতম অভিজ্ঞতার অর্থমূল্য যথাক্রমে ২২ লাখ ও ২৭ লাখ টাকা।
অভিযোগকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দরপত্রে সব যোগ্য দরদাতার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকার পরও কেউ দরপত্র জমা দিতে না পারলে সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তারা টেন্ডার বাক্সে জমা পড়া চারটি দরপত্র, উপস্থিত ব্যবসায়ীদের তালিকা, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যদের তথ্য এবং দরপত্র জমাদানের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে দরপত্র আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহীন আলম বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে ছিলাম। সেখানে চারটি টেন্ডার জমা পড়েছে। অন্যান্য ব্যবসায়ী ঘটনাস্থলে এসেছেন, কিন্তু কেন টেন্ডার জমা দেননি, এটি আমি বলতে পারব না। আমার বিরুদ্ধে টেন্ডার জমা প্রদানে বাধার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড পেট্রোবাংলার অধীন একটি রাষ্ট্রীয় গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ এ দরপত্র নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব যোগ্য দরদাতার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট মহলের অন্যতম দাবি।