শনিবার , ২৯ আগস্ট ২০২৬
 শনিবার , ২৯ আগস্ট ২০২৬

বিদ্যুতের লুকোচুরিতে বিপর্যস্ত জনজীবন

আইকন
ডেস্ক রিপোর্ট (প্রতিদিনের বাংলাদেশ)
২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৭ পূর্বাহ্ন
বিদ্যুতের লুকোচুরিতে বিপর্যস্ত জনজীবন

ছবি: এসআই


জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সারা দেশে আবারও বেড়েছে লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি হলেও তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।


ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে বিদ্যুতের লুকোচুরি। গ্রাম ও মফস্বলে পরিস্থিতি আরও নাজুক; কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।


পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিনের প্রথম ঘণ্টা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত দেশে লোডশেডিং ছিল প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে।


পরের ঘণ্টা থেকে তা কিছুটা কমলেও সকাল আটটা পর্যন্ত লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াটের ঘরে ছিল।


এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সর্বশেষ দুপুর তিনটার হিসাবে লোডশেডিং ছিল দেড় হাজার মেগাওয়াট।


এর আগে বুধবার ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর ছুটির দিনেও কোনো কোনো এলাকায় টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। কয়েক দিন কিছুটা স্বস্তির পর গ্রামাঞ্চলেও আবার দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ গ্যাসচালিত হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতিতে এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।


পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য গ্যাসের বরাদ্দ ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। সীমিত সরবরাহের গ্যাসের একটি অংশ বাণিজ্যিক গ্রাহক ও সার কারখানায়ও দেওয়া হচ্ছে।


গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। কয়েক সপ্তাহ ধরে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে বলে পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেখা গেছে।


লোডশেডিংয়ে আলুর পচন, দুশ্চিন্তায় চাষি ও ব্যবসায়ী

লোডশেডিংয়ে আলুর পচন, দুশ্চিন্তায় চাষি ও ব্যবসায়ী

অন্যদিকে গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।


পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্র থেকে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে; আগে যার পরিমাণ ছিল প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট।


পেট্রোবাংলার পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মু. শোয়েব জানান, ধীরে ধীরে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। তবে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো সরবরাহেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।


সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে আসছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। সর্বশেষ কেনাকাটায় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ২৪ ডলার। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে এ দাম ছিল ১২ থেকে ১৩ ডলার, আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজির দাম ছিল ৯ থেকে ১০ ডলার।


জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্ববাজার থেকে কেনা প্রতি ঘনফুট এলএনজির দাম প্রায় ৭৫ টাকা পড়ছে। সেই গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ১৪ টাকা দরে সরবরাহ করে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসে এক বছরের জন্য বরাদ্দ করা ভর্তুকির অর্থ গত দুই মাসেই খরচ হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।


স্বাস্থ্যসেবায়ও সংকটের আঁচ:


বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব পড়েছে ঢাকার বাইরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। 


মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিনে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি ও অপারেশন থিয়েটারের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।


অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত জেনারেটর না থাকায় তীব্র গরমে রোগী ও চিকিৎসকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। 


মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার সময় চার দিন ধরে ভর্তি থাকা আওয়াল মোল্লা বলেন, দিনের চেয়ে রাতের পরিস্থিতি আরও নাজুক। রাতে বিদ্যুৎ না থাকার পাশাপাশি এলেও ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে আবার চলে যায়।


ছয় বছরের জান্নাতের জ্বরও তীব্র গরমে বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ গেলে শহরের হাসপাতালে জেনারেটরের সুবিধা মিললেও সিঙ্গাইরের মতো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেই সুযোগ নেই। ফলে চিকিৎসার আলো যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানেই নেমে আসছে অন্ধকার।


সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও সৈয়দ ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই। অথচ চিকিৎসার জন্য অনেক জরুরি রোগী আসেন। তাদের সেবায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।


বিদ্যুৎ সংকট তাই এখন শুধু ঘর অন্ধকার হওয়ার সমস্যা নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে চিকিৎসাসেবার কেন্দ্রেও। আলোহীন হাসপাতালের করিডরে হাতপাখা আর মুঠোফোনের টর্চ যখন চিকিৎসার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন সংকটের গভীরতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।


কয়লা সংকট পেরিয়ে উৎপাদনে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র:


দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকট ও ঘাটতির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ে যখন চাপে জাতীয় গ্রিড, তখন সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে বাগেরহাটের রামপাল মৈত্রী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।


কয়লা সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় অতীতে উৎপাদন ব্যাহত হলেও বর্তমানে কেন্দ্রটির চালু থাকা দুই ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। 


এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ১০০ শতাংশ অ্যাভেইলেবিলিটি বজায় রেখে প্রায় ৬৪ কোটি ৩৬ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এ সময়ে কেন্দ্রটির গড় উৎপাদন ছিল প্রায় এক হাজার ৭৩ মেগাওয়াট।


এ ছাড়া জুন ২০২৬ মাসে কেন্দ্রটি থেকে প্রায় ৮২ কোটি ৭৩ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে, যা গড়ে প্রায় এক হাজার ১৪৯ মেগাওয়াট উৎপাদনের সমতুল্য।


রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপব্যবস্থাপক (অপারেশন) খান নোমান শিবলী বলেন, আমাদের রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি না করে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছি। জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন দেওয়া হচ্ছে।


কেন্দ্রটির মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম বলেন, বর্তমানে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আগে কর্মরত ভারতীয় প্রকৌশলীরা আমাদের নবনিযুক্ত বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এর ফলে আমাদের নিজস্ব প্রকৌশলীরা দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং এখন তারা সক্ষমতার সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছেন।


বর্তমানে যেসব ভারতীয় প্রকৌশলী রয়েছেন, তারা মূলত উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও জানান তিনি।


রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমানাথ পূজারী বলেন, আমাদের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটই চালু রয়েছে। কেন্দ্রটির মোট সক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। গ্রিডে যতটুকু চাহিদা থাকছে, আমরা ততটুকুই বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি।


এপ্রিল মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডের চাহিদা পূরণ করে আসছেন বলেও দাবি করেন তিনি।


বর্তমানে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত কয়লার মজুদ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও দাবি করেন, পরিবেশের বিষয়টি ঠিক রেখেই কেন্দ্রের সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আগামী দিনেও জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধারাবাহিক উৎপাদন জাতীয় গ্রিডের জন্য ইতিবাচক। পর্যাপ্ত কয়লা সরবরাহ ও কারিগরি সক্ষমতা বজায় রাখা গেলে কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।