রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা চুপ কেন?



রুবেল আহমদ: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে মানবাধিকারের খেতাব নিয়ে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গা একটি গালির নাম! মিডিয়ায় প্রতিদিন বিষয়টিকে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে যে আগামীতে মানুষ এদের পথেঘাটে পেলে পিটিয়ে মারবে। এই ভয়ে রোহিঙ্গারা দা-ছুরি বানাচ্ছে-সংগ্রহ করছে! সব মিলিয়ে এই মুহূর্তের পৃথিবীর বৃহত্তম শরণার্থী গোষ্ঠীকে নিয়ে বাংলাদেশে সৃষ্টি হচ্ছে একটি বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতি।

রোহিঙ্গারা পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নিচ্ছে, এই নিচ্ছে-সেই নিচ্ছে! অথচ রোহিঙ্গা যারা পৃথিবীর যত দেশে আছে সে সব দেশেতো তাদের বিরুদ্ধে এসব কোন অভিযোগ নেই অথবা সে সুযোগও নেই। সে সব দেশের কেউতো ইয়াবার নামও জানেনা। আপনার লোকজন ইয়াবা খায় বলেইতো এখানে এর বাজার আছে।

নিজস্ব পুলিশসহ পুরো পাসপোর্ট ব্যবস্থাটি দুর্নীতিগ্রস্ত বলেইতো বাংলাদেশে যে কারও পক্ষে পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। না ওই পাসপোর্ট অফিসারদেরও সবাই রোহিঙ্গা? এতো রোহিঙ্গার হাতে যে অবৈধভাবে মোবাইল ফোন চলে গেলো এরজন্যে দুর্নীতিবাজ একজনকেও কি ধরেছেন? না তাদের সবাই আপনার মামা-খালু লাগে? রোগের কারণ নির্মূল না করে লক্ষণে মলম লাগাবেন আর কতো?

বারবার একটা কথা বলি, তা হলো- রোহিঙ্গাদের একজনকেও কিন্তু মিয়ানমার ফেরত নেবেনা। আটকে পড়া পাকিস্তানিদের একজনকেও পাকিস্তান ফেরত নেয়নি। ভারত-চীন চায় না রোহিঙ্গারা আরাকানে ফেরত যাক। কারণ এদের ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত-চীন আপনার বন্ধু না। দেশ দুটি আরাকানে ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চায়। রোহিঙ্গারা আরাকানে ফেরত গেলে এটা সম্ভব নয়।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেও থাকতে চায় না। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের জন্যে যায়। ভারতে যায়। কিন্তু কোন একজন ভারতীয়ও অভিবাসনের জন্যে বাংলাদেশে আসেনা। বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে যেতে যে কারও পাসপোর্ট লাগে। কিন্তু আপনি তাদের যেতেও দেবেনা, রাখবেনওনা, মিয়ানমারও নেবেনা তাহলে কী করবেন? মেরেকুটে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিতেওতো পারবেননা। তাহলে কী করবেন সেটা সাফ-সাফ বলুন।

বাংলাদেশে একটা ভুল প্রচার আছে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের বদনাম বাড়াচ্ছে। কিন্তু আসল সত্য হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোতে ঢোকার আগে রোহিঙ্গারা এসব পাসপোর্ট ফেলে দেয়। কারণ রোহিঙ্গা পরিচয়ে সে মানবিক আশ্রয় পায়। হাতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট থাকলে আশ্রয় পায়না। বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে আশ্রয় পাওয়া সম্ভব হলে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের অবৈধ বাংলাদেশিরাও চটজলদি আশ্রয় পেয়ে যেতো।

বিদেশে আশ্রয় প্রত্যাশী বাংলাদেশিরা অর্থনৈতিক শরণার্থী। রোহিঙ্গাদের মতো জেনুইন রাষ্ট্রহীন শরণার্থী নয়। সে কারণে রোহিঙ্গারা উন্নত বিশ্বে পৌঁছতে পারলে প্রটেকশন-আশ্রয় পায়। তাদের মিয়ানমারের বিমানে তুলে ফেরত পাঠানো যায় না। কারণ মিয়ানমার তাদের স্বীকার করেনা।

রোহিঙ্গাদের কোন দেশ নেই রাষ্ট্র নেই। বাংলাদেশিদের দেশ-রাষ্ট্র আছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ অবিস্মরণীয় মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম শরণার্থী সমস্যা বাংলাদেশ দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিচ্ছে যেখানে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ নিয়ে কোন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেনি! এটা ভাবা যায়? কিন্তু এখন এই ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ যেন দিকভ্রান্ত!

সরকার সমর্থক এতো এতো বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবী দেশে! তাদের সঙ্গেও কি বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসা যায়না? না মান-সম্মানের ভয়ে নানাকিছুতে মুখ বন্ধ করে থাকা-চলার সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও এ ইস্যুতে কোন স্বাধীন মতামত দিতে রাজি না?
লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *