রাষ্ট্রকাঠামো অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছে

রুবেল আহমদ: রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী। তারা চিরকাল ক্ষমতায় থেকে সুযোগ-সুবিধা নিতে চান। রাষ্ট্রের পক্ষ যত রকমের দমনপীড়ন আছে তারা সেগুলোকে সমর্থন করতে পারেন নিজেদের স্বার্থে। পুলিশ বাহিনী প্রজাতন্ত্রের সেবক। তারা এ জন্য প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে সুযোগ সুবিধা পান যে, তারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখবেন, মানুষকে নিরাপত্তা দেবেন। তাই পুলিশ কর্তৃপক্ষ অন্যায়-অনাচারের পক্ষে অবস্থান নিলে জনগণের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। এখন হাজার হাজার মানুষের জান মাল ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে। অন্তত বিগত এক যুগে জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়ার পরিবর্তে পুলিশ ক্ষমতাসীনদের পক্ষে অন্ধভাবে অবস্থান নেয়ায় নাগরিকরা নির্মম নির্দয়তার শিকার হয়েছেন বাংলাদেশে।

বাস্তবে পুলিশের একটা অংশের নিয়মিত বর্বরতার শিকার সাধারণ মানুষ। একজন পুলিশ অফিসারের নেতৃত্বে ২০৪ জন ব্যক্তির বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যরা ভয়ে অভিযোগ করতে পারেননি। অথচ এই মানুষেরা দেশের প্রকৃত নাগরিক। সংবিধান তাদের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায়ও তারা বিঘ্ন ঘটাতে পারে না। বরং এ বাহিনীর দায়িত্ব রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। এ ধরনের একটি ঘোষণা তখনই পুলিশের পক্ষ থেকে দেয়া জরুরি ছিল, দেশে প্রথম মানুষটি যখন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছিলেন। এখনো চাইলে পুলিশ সব সাধারণ নাগরিকের স্বার্থে এ প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যে, এ দেশে আর একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যা ঘটবে না এবং এমনটি ঘটলে তারা এর প্রতিকার করবেন। কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা ধামাচাপা না দিয়ে তদন্তসাপেক্ষে সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হবে। এমন উদার স্বচ্ছ একটি প্রতিশ্রুতি দেয়ার জন্য পুলিশ এখন প্রস্তুত নয় বলে মনে হয়।

বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে দেশে যে গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে সেটা একেবারে বন্ধ করে দেয়ার অঙ্গীকার তারা ঘোষণা করতে পারতেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশপ্রধান ক্রসফায়ার নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন, তা পুলিশের সীমাহীন বাড়াবাড়িকে নিরুৎসাহিত করবে না। তিনি বলেছেন, ক্রসফায়ার এনজিওর সৃষ্টি। এক যুগে বাংলাদেশে কতগুলো ক্রসফায়ার হয়েছে সেই পরিসংখ্যান না হয় বাদ। তিনি যখন পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় হত্যার শিকার হওয়াকে ‘ক্রসফায়ার’ বলতে চাচ্ছেন না, তখন একজন পুলিশ অফিসারের অধীনে ২০৪ জন মানুষ প্রাণ হারানোর ঘটনার খবর জানা যাচ্ছে। এভাবে মানুষ হত্যায় পুলিশের পক্ষ থেকে গুলি ছোড়াকে কি কেউ ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বলবে? ।

চাপে পড়লে একটা তাৎক্ষণিক বিহিত করার চেষ্টা প্রচেষ্টা এখন খুব দেখা যায়। হত্যার পরও এমনটা দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া আবশ্যক। সে ধরনের কোনো আয়োজন আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। তবে এ সুযোগে জাতির সোচ্চার হওয়া উচিত যাতে করে রাষ্ট্র বিচারবহির্ভূত প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান চালায় এবং বিচার পাওয়ার একটি ব্যবস্থা করে দেয়। অন্ততপক্ষে এ ব্যবস্থার জন্য সরকার সামনে এগোতে পারে, যাতে সামনে আর একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে হতে না পারে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় আরো কিছু স্পর্শকাতর ঘটনার। ওইসব ঘটনায় অনেক কর্তা ও প্রধান ব্যক্তিরা জড়িত বলে খবর আসছে। প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে কোনো কথা নেই। অনেক ন্যায্য কথা বলার সাহস ও শক্তি রাখে না এ দেশের প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যম। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব ভয়াবহ ঘটনার ব্যাপারে অনেকে কথা বলে উঠছেন। অর্থাৎ বিকল্প মাধ্যমে এগুলো প্রকাশ হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের স্বার্থে ওইসব ঘটনার তদন্তে সরকারের নিজস্ব উৎসাহ থাকা উচিত। রাষ্ট্রের ভিতরে ‘আরো রাষ্ট্র’ গড়ে উঠলে সেটা আসলে একটা দুর্বল রাষ্ট্র্র। এই রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষেরা তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার চর্চায় একেবারে দুর্বল বলতে হবে। প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যম যদি এসব খবর যথাসময়ে প্রকাশ করতে পারত তাহলে এত বেশি অন্যায় ও দুর্নীতি এ দেশে হতে পারত না। সরকারের ক্ষমতা চর্চার চাপে সংবাদমাধ্যম ধরাশায়ী হয়ে রয়েছে এটা ঠিক, তবে সরকার এতটা কর্তৃত্ববাদী হওয়ার পেছনে এ দেশের প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যমেরও দায় রয়েছে।

পুলিশের অনেকেই ‘দানব’ হয়ে উঠেছেন। সবার স্বার্থে তাদের অন্ততপক্ষে থামানো দরকার। অনেক ঘটনায় এটা প্রমাণিত হচ্ছে, এই দানবদের ঠেকানোর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। কারণ উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিয়েও নানা কারণে ভুক্তভোগীরা বিচার পাচ্ছেন না। প্রদীপরা যেভাবে উচ্চ আদালতকে পাশ কাটাতে পেরেছেন, সেটা নজিরবিহীন। হামিদা বেগম মুঠোফোনে তার স্বামী আবদুস সাত্তারের সাথে স্থানীয় কিছু লোকের বিরোধ ছিল। প্রতিপক্ষের লোকজনের সঙ্গে আঁতাত করে টাকার বিনিময়ে মহেষখালী থানার তৎকালীন ওসি সহ অন্য পুলিশ সদস্যরা তার স্বামীকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। থানায় মামলা করতে না পেরে ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি উচ্চ আদালতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

হামিদা বেগমের আসলে আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তার ওপর বড় আশঙ্কা সৃষ্টি হলো তার দুই ছেলের জীবন নিয়ে। তার দুই ছেলেকেও ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি ততদিনে তিনি পেয়ে গেছেন। পত্রিকাটি খবর দিচ্ছে, এই লবণচাষির দুই ছেলে এখন পানের বরজে কাজ করে সংসার চালান। বাবার হত্যার বিচার তারা পাননি; তবে তারা খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারছেন।

পুলিশ অফিসাররা নিজেরা কখনো একপ্রকার ‘দানব’ হয়ে যাচ্ছেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। তারা যা চাচ্ছেন, আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগের মতো সব পেয়ে যাচ্ছেন। এ সুযোগে মানুষ মেরে হলেও বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যাচ্ছেন। তাদের সিন্ডিকেটে যারা রয়েছেন তারাও হয়তো তার কিছু ছিটেফোঁটা পাচ্ছেন। তাই তারা রাষ্ট্রের পুরো শক্তি নিজেদের নির্মমতা আড়াল করার কাজে ব্যয় করছেন। এর দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়ে বর্তাবে। সরকার কেন এই দায়ভার নেবে? এমন হত্যার উৎসব চালিয়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের তো কোনো লাভ নেই। বরং এই দলের অনেক সদস্যও প্রদীপদের নির্মমতার শিকার। রাষ্ট্র ক্ষমতা আর যেন কারো দানবতার জন্য ব্যয় না হয় সে দিকে সরকার চাইলে নজর দিতে পারে। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *