মিথ্যা মামলায় হয়রানি বন্ধ হবে কি?

রুবেল আহমদ: গণতান্ত্রিক দেশে আইন সরকার ও আইন মান্যকারী নাগরিকদের হাতে আত্মরক্ষার একটি উত্তম হাতিয়ার। কিন্তু যে হাতিয়ারে আত্মরক্ষা করা যায়, সেই হাতিয়ার দিয়ে আত্মহত্যা কিংবা মানুষ হত্যাও করা যায়। তাই যারা আইন প্রয়োগ করেন তাদের এ ক্ষেত্রে সর্বদাই সচেতন থাকতে হয়।

এক শ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করতে অভ্যস্ত। পেশি শক্তির জোরে মানুষকে হয়রানি বা নির্যাতনের ফলে যখন নিজেদের ফৌজদারি মামলার আসামী হতে হয় তখন তারা আইনকে ব্যবহার করে তাদের প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করেন। আইন যেখানে মানুষকে অপরাধের হাত থেকে রক্ষা করার কথা সেখানে আইনকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে ঘায়েল করা হয়।

কোন রাষ্ট্রের ফৌজদারি অপরাধ হল মূলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই কৃত অপরাধ। সামান্য কিছু ব্যতীক্রম ছাড়া ফৌজদারি মামলার বাদী রাষ্ট্রই। এজাহারে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের কোন কর্মচারী বাদী না হলেও ফৌজদারি মামলার পক্ষ হল রাষ্ট্রই। রাষ্ট্রের পক্ষ্যে কোন বাদী আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। ফৌজদারি মামলায় সরকার একটি পক্ষ ও আসামীরা অন্য একটি পক্ষের হয়ে থাকে। উচ্চতর আদালতে ফৌজদারি মামলার নামকরণও এমনই হয়ে থাকে।

যাহোক, এক শ্রেণির মানুষের মিথ্যা মামলা করা কিংবা মিথ্যা সংবাদ নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিভ্রান্ত করা কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা এক প্রকার ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সুবিচার দেয়ার পাশাপাশি মিথ্যা মামলা বা হয়রানি থেকে বাঁচাবার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের ১৮৬১ সালের দণ্ড বিধিতে পুলিশ বা রাষ্ট্রযন্ত্রকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া ও মিথ্যা মামলা দায়েরের বিরুদ্ধে শাস্তির ধারা রয়েছে।

অন্যদিকে, দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুসারে কোন ব্যক্তি যদি কারো বিরুদ্ধে, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে মামলা রুজু করান আর সে মামলা যদি তদন্তে বা বিচারে মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি অপরাধটি সংঘটিত করেছেন বলে ধরে নেয়া হবে। এক্ষেত্রে যদি অভিযোগটি সাধারণ প্রকৃতির হয় তবে বাদীর দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম জেল ও জরিমানা কিংবা উভয়বিধ সাজা হতে পারে। কিন্তু যে মিথ্যা অপরাধে তাকে হয়রানি করা হয়েছে তা যদি যাবজ্জীবন কিংবা সাত বছর পর্যন্ত জেলের শাস্তিযোগ্য হয়, তাহলে বাদীর সাত বছর পর্যন্ত জেল কিংবা জরিমানাসহ জেল হতে পারে।

১৮২ ধারা ও ২১১ ধারার মধ্যে পার্থক্য হল, ১৮২ ধারায় মিথ্যা খবর দেয়ার মধ্যে অপরাধটি সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ পুলিশকে মিথ্যা খবর দিলেই অপরাধটি সংঘটিত হয়ে যাবে। কিন্তু ২১১ ধারায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করার পরে তা তদন্তে বা বিচারে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরেই অপরাধটি এ ধারায় শাস্তিযোগ্য হবে।

আমাদের দণ্ড বিধির ১৮২ ও ২১১ ধারা দুইটি অধর্তব্য। অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেট এর অনুমতি ছাড়া এ দুই ধারায় মামলা রুজুও হবে না, পুলিশ তা তদন্তও করতে কিংবা আসামী গ্রেফতার করতে পারবে না। ১৮২ ধারার প্রয়োগটি খুবই সীমিত। তবে ২১১ ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণের যথেষ্ঠ নজির রয়েছে।

পুলিশ তদন্তের ঐতিহ্য অনুসারে কোন মামলায় যখন তদন্তকারী কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিথ্যা প্রদান করেন, তখনই বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রসঙ্গটি আসে। এ ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলায় বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতের কাছে আবেদন করেন। (তবে বিআরবির ২৭৯ প্রবিধির আদেশ অনুসারে এ জন্য একটি পৃথক অভিযোগ আদালতে প্রেরণ করতে হবে)। আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করলে তদন্তকারী কর্মকর্তার ২১১ ধারায় বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। তবে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি হবে না, তার সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার আদালত বা ম্যাজিষ্ট্রেটের। এক্ষেত্রে সরকার পক্ষ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক ২১১ ধারার প্রসিকিউশন শুরু করা তথা পুলিশকে অনুসন্ধান পুর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা কামনা করতে পারেন। অধিকন্তু আদালত নিজ উদ্যোগেই পুলিশ প্রতিবেদন ছাড়াই মূল মামলার বাদী তথা মিথ্যা মামলা করার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ আমলে নিতে পারেন।

এখানে আমি এসিড অপরাধ দমন আইন ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মামলাগুলোর একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরব। গত সাত বছরে এ আইনের আওতায় মোট ৩৩৫৫টি মামলা রুজু হয়েছিল। কিন্ত তদন্তে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়েছে ১২৭৫ টিতে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে ৪৮১টি মামলায়। চূড়ান্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য ৩২৬টি। অর্থাৎ ঘটনা সত্য হলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এসব ঘটনা। চূড়ান্ত প্রতিবেদন তথ্যগত ভুল দেয়া হয়েছে ১৮০ টিতে। অর্থাৎ এসিডের ঘটনার ক্ষেত্রে তথ্যে বিভ্রাট রয়েছে। হয়তো এসিডে ঝলসানো হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে এটা ছিল নিছক দুর্ঘটনা। অথবা ঝলসানোর কথা বলা হলেও তা এসিড জাতীয় দ্রব্য ছিল না ।

চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিথ্যা দেয়া হয়েছে ৩৮২টিতে। এর অর্থ হল এসিড নিক্ষেপ তো নয়ই, এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি যাতে আসামীরা দোষী হতে পারে। এসব ঘটনায় বাদী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য মামলা করে পুলিশ ও আদালতকে অপব্যবহার করেছে।লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *