মাদক বিরোধী যুদ্ধ বনাম বিচারবহির্ভূত হত্যা

রুবেল আহমদ: বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানে বিনা বিচারে হত্যার অভিযোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করেছে অনেক আগেই। ২০১৮ সালে যখন ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু হয়, জনগণের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল যে, মাদক চোরাচালান, পরিবহন ও বিপণন একেবারে বন্ধ না হলেও সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে এবং মাদক কারবারি ও গডফাদাররা আইনের আওতায় বিচারের সম্মুখীন হবে।

ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে এবং অনেক মাদক কারবারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হয়েছে। কিন্তু ইয়াবা ব্যবসা নির্মূল করা যায়নি। বাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা কারবারি ধরা পড়লেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত গডফাদার ও সিন্ডিকেট সদস্যরা রয়েছে ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’। মেজর (অব:) সিনহা রাশেদ খানের হত্যার তদন্ত নিয়ে যখন স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যতিব্যস্ত, তখন ৬০ কোটি টাকা মূল্যের ১৩ লাখ ইয়াবার একটি বড় চালান কক্সবাজারের বাঁকখালি নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নৌকা থেকে খালাসের সময় এক কোটি টাকার ইয়াবা লুটও হয়ে যায়। এতে বুঝা যায় মাদকসংশ্লিষ্ট রাঘববোয়ালরা কত শক্তিশালী।

বিগত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে পেশাজীবী এবং নানা বয়সী মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে ‘ইয়াবা’ আসক্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন মতে, ২০১৭ সালে বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধারই করেছে চার কোটি ইয়াবা, যা ২০১৫ সালের দ্বিগুণ। এ থেকেই দেশে ইয়াবাসেবীদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্টগার্ড মিলে উদ্ধার করেছে তিন কোটি ৫৩ লাখ ২৫ হাজার ৬১০ পিস ইয়াবা। জানা গেছে, মিয়ানমারে প্রতি পিস ইয়াবার দাম পড়ে গড়ে ৩০ টাকা। এই হিসাবে উদ্ধার হওয়া ও উদ্ধারের বাইরে থাকা সব মিলিয়ে ৩০ কোটি ইয়াবার মূল্য বাবদ ৯০০ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে মিয়ানমারে।

মাদকবিরোধী যুদ্ধাভিযান শুরুর পরপরই দেখা গেল, মিয়ানমার-কক্সবাজার সীমান্তে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’ বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৫ মে থেকে ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৪২৪ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১১৯ জন, পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে ২১৫ জন, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাথে বন্দুকযুদ্ধে ৪৮ জন, বিজিবি ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে ৩ জন এবং বিজিবির সাথে বন্দুকযুদ্ধে ৩৯ জন নিহত হয়। এর বাইরে ৩২ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বিবিসির মতে, মাদকবিরোধী যুদ্ধে প্রতিদিন একজন করে মানুষ ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে।

২০১৯ সালের ২৬ মে টেকনাফে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সেখানকার পৌর কাউন্সিলর ও স্থানীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. একরামুল হকের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে রেকর্ড করা অডিও কিছু সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছিল। তাকে বাসা থেকে র‌্যাব এবং ডিজিএফআই এর স্থানীয় দু’জন কর্মকর্তা ডেকে নেয়ার পর হত্যা করা হয় বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। কিন্তু, র‌্যাব বলেছে, প্রকাশ হওয়া অডিও খতিয়ে দেখছে তাদের সদর দফতর।

জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধসহ একরামের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ম্যাজিসটারিয়াল ইনকোয়ারির মাধ্যমে যুবলীগ নেতা একরাম হত্যার যদি সুষ্ঠু তদন্ত হতো এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা যেত তাহলে মেজর (অব:) সিনহার হত্যা রোধ করা যেত।

২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারা দেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে সরকার। এতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় ক্রসফায়ারের পরিসংখ্যান। গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত ২৮৭ জন। এর মধ্যে পুলিশের সাথে ১৭৪, বিজিবির সাথে ৬২ ও র‌্যাবের সাথে ৫১ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। আর টেকনাফে পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১৬১ জন। এমন অভিযানের পরও কমেনি মাদকের চোরাচালান বরং কিছু ক্ষেত্রে মাদকের সরবরাহ বাড়ার তথ্য মিলছে। এমন বাস্তবতায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে কথিত ক্রসফায়ারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

২০১৭ সালে ১৪ হাজার ৬৫৮ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার সদস্যই কনস্টেবল থেকে সাব ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার। এই বছর এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব মাত্র ৮ জন কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড (তিরস্কার, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি) দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের কেউ গুরুদণ্ড পাননি। ২০১৬ সালে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে দু’জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে লঘুদণ্ড, অন্যজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। এই গুরুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তি হলেন স্ত্রী মিতু খুন হওয়ার ঘটনায় আলোচিত এসপি বাবুল আক্তার।

২০১৯ সালে এ পর্যন্ত দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন ডিআইজি মিজানুর রহমান এবং এসপি পদমর্যাদার উপ-কমিশনার (ডিসি) ইব্রাহিম খান। ডিআইজি মিজানকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় কারাগারে পাঠানোর পর তাকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। একইভাবে পুরান ঢাকায় এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখলে সহযোগিতার অভিযোগে লালবাগ জোনের সাবেক ডিসি মো. ইব্রাহিম খানকে গত আগস্ট সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পিআরবি-১৮৬১ (পুলিশ প্রবিধান) অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, বেতনবৃদ্ধি স্থগিত ও বিভাগীয় মামলা হয়। মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইনস বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেয়া হয়। বিসিএস ক্যাডারের পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ (শৃঙ্খলা ও আপিল) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগে একজন যুগ্ম সচিবের অধীনে একটি সেল রয়েছে (প্রাগুক্ত)। বিচারবহির্ভূত হত্যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে বিদ্যমান বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হবে। বিচারের দীর্ঘপ্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখে না। ক্রসফায়ারে কোনো মাদকব্যবসায়ী বা গডফাদারের মৃত্যু হলে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর পরিণতি যে কত ভয়াবহ হয় তা জানতে ও বুঝতে বেশি দিন সময় লাগে না। বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করা না গেলে আইনের শাসন ভেঙে পড়বে এবং বিচারব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে। সব নাগরিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার অধিকার রক্ষায় সহযোগিতা করতে পুলিশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের বিচারপ্রার্থী এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ না থাকলে উন্নয়নের চাকা আটকে যাবে। ইতিহাস প্রমাণ করে, কালো আইন অথবা এক্স্ট্রা জুডিশিয়াল কিলিং বুমেরাং হয়েছে অথবা ফ্র্যাংকেনস্টাইনের রূপ ধারণ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সংহার করেছে।লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *