মাছের বাজারে প্রতারণা

রুবেল আহমদ: একসময় বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ একটি মৎস্য অঞ্চল। এর নির্দিষ্ট আয়তনে এত বেশি প্রজাতির মাছ পৃথিবীর আর কোথাও ছিল না। মাত্র সাত-আট দশকের মধ্যে আমরা সেই সম্পদ প্রায় শেষ করে দিয়েছি নিজেদের ক্ষমাহীন অজ্ঞতা ও অবহেলায়। মুক্ত জলাশয়, খাল-বিল, নদী-নালা ক্রমেই গ্রাস করে চলেছি। যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা-ও ভয়ংকর দূষণের শিকার। উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ করায় পানির প্রবাহ নষ্ট হয়ে গেছে। নদীর অনেক মাছ বর্ষায় প্লাবনভূমিতে এসে ডিম পাড়ত, তাদের সেই প্রজননচক্র নষ্ট করে দিয়েছি। এর ফলে মাছে-ভাতে বাঙালি—এই উপমাটি ক্রমেই যেন তার অর্থ হারিয়ে ফেলছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। বহু বাঙালির পাতেই এখন আর নিয়মিত যোগ হয় না মাছের নানা ব্যঞ্জন। তবু ভোজনবিলাসী বাঙালির রসনা খুঁজে ফেরে মুক্ত জলাশয়ের বাহারি নামের নানা প্রজাতির সেই প্রিয় মাছগুলো, যার বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে বাংলার মানচিত্র থেকে। কোনো রকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে কিছু প্রজাতি।

এখন বাজারে যেসব মাছ পাওয়া যায় তার বেশির ভাগই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হওয়া। আবার এসব মাছ কিনে প্রতারিত হতে হচ্ছে ক্রেতাদের। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তিন দিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ক্রেতাদের এই প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বাজারে ওজন বাড়াতে ও শক্তপোক্ত দেখাতে মাছে সিরিঞ্জ দিয়ে ঢোকানো হয় মারাত্মক ক্ষতিকর, এমনকি জীবননাশী রাসায়নিক জেলি। এক কেজি মাছে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত জেলি পাওয়া যায় বলে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশি মাছ বলে চাষের মাছ গছিয়ে দেওয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা মাছও বিক্রি হচ্ছে দেশি বলে। সাগর বা উপকূলীয় নদ-নদীর ইলিশকেই ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ক্রেতাদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে দামও বেশি রাখা হচ্ছে। শুধু মাছের বাজারে নয়, অধুনা সম্প্রসারিত হচ্ছে অনলাইন বিপণনব্যবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, এখানেও মাছ বিক্রির নামে চলছে এই প্রতারণা। হাওরের মাছ, নদীর মাছ, টাটকা মাছ, দেশি মাছ ইত্যাদি নাম দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে বাজারের মাছই বিক্রি করা হচ্ছে। দামও রাখা হচ্ছে দ্বিগুণ বা তার চেয়ে বেশি।

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাছের বাজারে নৈরাজ্য ও প্রতারণা ঠেকাতে সবার আগে ভোক্তার সচেতনতা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা কঠোর তদারকি করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *