বিচারপতি তোমার বিচার…’

রুবেল আহমদ:‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/আজ জেগেছে এই জনতা/তোমার গুলির, তোমার ফাঁসির/তোমার কারাগারের পেষণ/শুধবে তারা ওজনে তা/এই জনতা জনতা।’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই গানটি প্রচারিত হয়েছে বারবার। গানটি অন্যায় আদেশ, অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আমাদের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছে। সলীল চৌধুরীর কথা ও সুরে গানটির মর্মার্থ এখনো জাগরূক। আজো অন্যায়, অনাচার ও অত্যাচারের বিপক্ষে গানটি ঝঙ্কার তোলে। গানটি হিতকর, নীতিবোধক। কবিতায় বা গানের বাণীতেই বিচারের আবেদন-নিবেদন সীমিত। ব্যবহারিকভাবে কি এর প্রয়োগ ঘটে? বিপ্লব বা আন্দোলনের সমাপ্তিতে জনগণ অন্যায়কারীর বিচার চায়। হয়তো তার পরিসমাপ্তি ঘটে কোনো নৃশংসতায়। একে বিচার না বলে ক্ষোভের প্রকাশ বা প্রতিহিংসার অবসান বলা যায়। বাস্তবে বিচারপতিদের বিচারের সম্মুখীন হতে হয় কদাচিৎ। ইতিহাসে এর উদাহরণ খুব বেশি নেই। বাংলাদেশে ১৩ আগস্ট এক বিচারপতির বিচার শুরু হয়েছে। ১৮ আগস্ট সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২৫ আগস্ট শুনানি আবার শুরু হবে। এই মামলা এবং মামলার আসামি সাধারণ কেউ নন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। বাংলাদেশের ইতিহাসের একেকটা বাঁকে বিরল ঘটনা ঘটে। এটিও তার একটি। অথচ তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রধান রক্ষক। সত্যের প্রতীক। অত্যাচারিতের আশ্রয়স্থল। বিচার বিভাগের অভিভাবক। সুতরাং যেকোনো বিচারে তিনি অসাধারণ। যে ‘ন্যায়দণ্ড’ প্রয়োগ করে তিনি সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন, যে আদেশে জীবন ও মৃত্যুর ফায়সালা করেছেন সেই ন্যায়দণ্ড আজ তারই ওপর আপতিত।

দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। একই সাথে সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বিচারের ঘটনা এই প্রথম। এস কে সিনহা কোথায় অবস্থান করছেন তা নিশ্চিত নয়। আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় না পেয়ে কানাডায় প্রবেশ করেছিলেন। সূত্র বলছে, তিনি কানাডা বা অস্ট্র্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। দেশের এক সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী ব্যক্তিত্ব সিনহার ভাগ্যবিপর্যয় শুরু হয় ২০১৭ সালে। ঘটনার কারণ, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী। বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ওই সংশোধনী আনা হয়েছিল। ওই সংশোধনী দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়। ওই সময় প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে সরকারের সাথে টানাপড়েন শুরু হয়।

সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সিনহার পদত্যাগের দাবি ওঠে। অনেক মানুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবে সিনহার পক্ষ নেয়। বিএনপি সরকারবিরোধী রায়কে স্বাগত জানায়।

অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা- অবশেষে প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর। এরই মধ্যে কূটকৌশলে তার পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়। ঘটনার শেষ এখানেই নয়। যে সরকারের দৃঢ় আস্থায় তিনি বিচারের সর্বোচ্চ পদ পেয়েছিলেন তারাই তাকে দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিত করে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। দুদকের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী মামলার বিবরণ দিয়েছেন। তার ভাষায়, চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতিসহ ১১ জন। এর মধ্যে আট আসামি পলাতক, দুইজন জামিনে এবং একজন কারাগারে রয়েছেন। অপর দিকে আসামিপক্ষের বক্তব্য : যে চার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্য নয়। আইন অনুযায়ী, সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে সিনহার দুই আপনজন শাহজাহান এবং নিরঞ্জন সাহা ঋণের আবেদন করেন। ফারমার্স ব্যাংকে ওই আবেদন করা হয়। যে টাকা তারা লোন চেয়েছিলেন সেই টাকার বিপরীতে ব্যাংকের কাছে সম্পত্তি বন্ধক রাখা আছে। তারা ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চার কোটি টাকার বিপরীতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। দুদকের বক্তব্য : ভুয়া তথ্য দিয়ে ফারমার্স ব্যাংক যা বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক নামে অভিহিত তা থেকে সরাসরি সিনহার নামে না নিয়ে অন্যের নামে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরে তা প্রধান বিচারপতির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। ফারমার্স ব্যাংকের মালিক মহিউদ্দিন খান আলমগীর ওই চার কোটি টাকা সিনহাকে ঘুষ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ভুয়া ঋণ নেন। আবার একই দিন পে-অর্ডারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করেন। ওই টাকা থেকে অস্বাভাবিক নগদে, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে অন্য হিসাবে হস্তান্তর ও রূপান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়। অভিযোগে আরো বলা হয়, বিচারপতি সিনহার দু’জন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দু’টি চলতি হিসাব খোলেন। পরদিনই তারা দুই কোটি করে চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর তাকে বিদেশে যেতে বাধ্য করা হয়। যাওয়ার মুহূর্তে তিনি গণমাধ্যমের প্রতি একটি বিবৃতি ছুড়ে দেন। তাতে তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই এবং চিরদিনের জন্য দেশত্যাগও করছি না’। কিন্তু তার পরিবারের প্রতি ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কথিত গোয়েন্দা সংস্থা নানা কারসাজি করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে বলে প্রকাশিত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থে একটি বড় অধ্যায়জুড়ে তিনি সরকারকে সহায়তার বিশদ বিবরণ দেন।

কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। তা বিচারপতি বা রাষ্ট্রপতি যেই হোক না কেন! কিন্তু আইন যদি একদেশদর্শী হয় এবং ভিন্নমত দমনের স্বার্থে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা কাম্য হতে পারে না। বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলা এবং নিগ্রহমূলক কার্যকলাপের একমাত্র কারণ : ‘ব্যক্তি কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ’। তিনি এভাবেই গ্রন্থের উপসংহার টানেন। ন্যায় ও অন্যায়ের সীমা-পরিসীমা আমাদের জানা নেই। কিন্তু ‘আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে/হেনেছে নিঃসহায়ে/ আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে/বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ আমরা বিশ্বাস করি, আজ হোক কাল হোক নিরেট সত্যের প্রকাশ ঘটবেই। ‘ট্র্রুথ শ্যাল প্রিভেইল’। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *