নারীর অধিকার ও সমাজব্যবস্থা

রুবেল আহমদ: বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ অর্থাৎ সব কল্যাণকর বিষয়ে যতটুকু পুরুষের অবদান, ঠিক ততটুকুই নারীর। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি অবদান নারীর। কিন্তু তারপরও সমাজে নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেয়া হয় না। নারী-পুরুষ সমঅধিকারের বিষয়টি এখনও অনেকাংশে কাগজে কলমে থেকে গেছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। কিন্তু এই নিয়মগুলো যখন বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়, তখনই শুরু হয়ে যায় ঝামেলা।

প্রায় দু’শ বছর আগে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করেছেন। প্রায় দেড়শ’ বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ চালু করেছেন। বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছেন। তারও আগে রানী ভবানী রাজ্য চালিয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রীতিলতা সেন নিজের জীবন দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সম্মুখযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতার জন্য তিন লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন।

এসব তো অনেক আগের ঘটনা। তখন কমসংখ্যক মানুষ শিক্ষিত ছিল। আর এখন শিক্ষার হার বেড়েছে। মানুষের চিন্তাধারার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু যখনই নারীর অধিকারের প্রশ্ন সামনে এসেছে, তখনই মানুষের চিন্তাধারা দেখে মনে হয়েছে, সমাজের অগ্রযাত্রা হয়তো আরও দু’শ বছর পেছনে চলে গেছে। আমরা মুখে নারী অধিকারের কথা বলব, অথচ ঘরের বউকে বাইরে চাকরি করতে দেব না। বিয়ের সময় মেয়ের বাবাকে যৌতুক দিতে হবে। মেয়ে যদি অল্প শিক্ষিত হয় তাহলে ভালো কথা; কিন্তু যদি উচ্চশিক্ষিত হয় তাহলে বিয়ের আগেই বলতে হবে- মেয়ে এখন যা করছে করুক, কিন্তু বিয়ের পরে চাকরি করতে পারবে না। আমরা মুখে বড় বড় কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশের মানসিকতা এরকম। সব ধর্মেই মায়েদের সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে, মা স্বর্গের থেকেও বড়। তারপরও বাস্তব জীবনে অধিকাংশ নারী তাদের যোগ্য সম্মান পান না।

দেশের অর্ধেক মানুষ নারী। তাদের অগ্রাহ্য করে দেশ ও জাতির উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়। নারীর অধিকার কখনও আপসে কেউ দেয়নি। যে অধিকার তাদের প্রাপ্য তা কেন আইন পাস করে তাদের দিতে হবে? নারীদেরই তাদের নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন তাদেরকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ সমাজে মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়া মানেই সারা জীবন সংগ্রাম করে বাঁচতে হবে। তাই প্রত্যেক মেয়েকেই শিক্ষিত হতে হবে নিজের চেষ্টায়। যে পরিবারের সমর্থন পাবে, তার চলার পথ সহজ হবে; যে পরিবারের সমর্থন পাবে না, তার চলার পথ কঠিন হবে- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাকে এ সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। আর আমাদের পুরুষদের নিজেদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *