দুর্নীতি ও রাজনীতি

রুবেল আহমদ: নীতিগতভাবে দুর্নীতিকে অনুমোদন করেন এমন কেউ কোথাও নেই। আবার দুর্নীতি দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত নন এমন লোকের দেখা পাওয়াও ভার। ওয়ান-ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে তদানীন্তন জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী সদ্য গজিয়ে ওঠা দুর্নীতি দমন কমিশনের- ‘দুদক’ প্রধান ছিলেন। এক সেমিনারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বকাঝকা করছে সবাই।

আমি বললাম, বাংলাদেশের কোটি মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় দুর্নীতির পক্ষে আছে কেউ? সবাই বলবে, কেউ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সবাই আছে। দুর্নীতির পরীক্ষায় উত্তীর্র্ণ হওয়া কঠিন। যখন নিজের স্বার্থ ও সুবিধার প্রশ্ন আসে সবাই দুর্নীতির কাছে আত্মবিকৃত।

দুর্নীতির রাজ্য-সাম্রাজ্য অনেক বিস্তৃত। এই বিষবৃক্ষের শাখা-প্রশাখা অনেক। এই আহাজারি শুনতে শুনতে আপনাদের ভোর হয়ে যাবে। তাই একটি শাখায় আরোহণ করতে চাই। ‘মোখতাছার বয়ান’ করতে চাই। যে শাখাটিকে ভর করে আছে অন্য শাখা-প্রশাখা, সেখানেই আঘাত করতে চাই। মহাকবি কালিদাস নাকি একদিন যে শাখায় বসেছিলেন সেই শাখাতেই আঘাত করছিলেন। ‘দেবদূত’ তা দেখে তাকে বর দিয়েছিলেন। মহাপণ্ডিত হয়েছিলেন তিনি। আমাদের সেরকম আশা-দুর্নীতি যদি দেবগুণে নীতিতে পরিণত হয়। আমরা তো দেবদূতে বিশ্বাস করি না। আল্লাহর রহমতের আশা করি। তিনি ইচ্ছা করলে বদলে দিতে পারেন সবকিছু। ‘লা তাকনাতু মির রহমাতিল্লাহ’। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে চাই না। আশার কথা, আমাদের ডান-বাম, লাল-নীল-সবুজ সব রাজনৈতিক দলেরই কমন স্লোগান, ‘এ সমাজ ভাঙতে হবে, নতুন সমাজ গড়তে হবে’। বুঝতে পারছি রাজনীতিই হচ্ছে সমাজের ভাঙা-গড়ার হাতিয়ার। রাজনীতিই হচ্ছে দেশের ভাগ্যবিধাতা; দেশ পরিচালনার চাবিকাঠি। যাদের হাতে সেই চাবিকাঠি তাদের মেজাজ-মর্জি, ধরন-ধারণ ও বিষয়-বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে নীতি অথবা দুর্নীতি।

সংবিধানের প্রথমেই বলা আছে, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’! আসলে তো ক্ষমতাই সকল রাজনীতির উৎস। মাঝে মধ্যে রাজনীতিবিদরা আপ্তবাক্য আওড়ান, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’।

বাস্তবে উল্টো। ‘দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’। দেশ বা জনগণ গোল্লায় যাক তাতে কিছু যায় আসে না। সবারই মন্ত্র ‘আমার সোনার হরিণ চাই’। নীতি নয়, দুর্নীতিই সেই সোনার হরিণের বাহন। এ দেশের খুচরা এবং পাইকারি নেতা, আধা নেতা, পাতি নেতা, রাঘববোয়াল আর পুঁটি নেতা সবারই একমাত্র আরাধ্য অর্থ-বিত্ত ও চিত্ত নয়। লোকেরা মিছা কথা কয়। অর্থই অনর্থের মূল। টমাস ফুলার বলেন, ‘অর্থ ও ক্ষমতার লোভে মানুষ যেকোনো পর্যায়ে নেমে যেতে পারে’। আজকের বাংলাদেশ এর বাস্তব প্রমাণ।

অতীতের চেয়ে ভবিষ্যৎ ভালো হয়নি। বিগত এক যুগ ধরে বাকশালের চেয়েও নিকৃষ্ট শাসনব্যবস্থায় অতিক্রান্ত হচ্ছে দেশ। আগেরটি ছিল আইনি কাঠামোর মোড়কে, এখনকারটি বেআইনি-বেপরোয়া সড়কে। সবচেয়ে সর্বনাশ করছে রাজনৈতিক দুর্নীতি। এই দুর্নীতির দু’টি দিক- কাঠামোগত ও প্রক্রিয়াগত। সংসদীয় গণতন্ত্রের মোড়কে যদি অবশেষে আইনি ও বেআইনি বাকশাল কায়েম হয় সেটি কাঠামোগত দুর্নীতি। আরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো বা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গণতন্ত্রের পরিপূরক না হয় তাহলে সেটিও কাঠামোগত দুর্নীতির লক্ষণ। অপরদিকে এই কাঠামোগত পরিবর্তনের অনুষঙ্গ হচ্ছে- আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এগুলোর গঠন প্রক্রিয়া, কাঠামো এবং উদ্দেশ্য যদি গণতন্ত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এর পরিপূরক না হয় তাহলে তা প্রক্রিয়াগত দুর্নীতির প্রমাণ বহন করে।

দুর্নীতি দূর করার গতানুগতিক পদ্ধতি সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের মতামত- সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এগুলো তখনই সম্ভব, যখন দেশে রাজনীতি সচল থাকে। এ সম্পর্কিত গবেষণা সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দুর্নীতি সেসব দেশেই প্রবল যেখানে রাজনীতি অনুপস্থিত। আর রাজনীতির অপর অর্থ- গণতন্ত্র। একটি চিরায়ত প্রবাদবাক্য : ‘অ্যাবসোলিউট পাওয়ার, করাপটস অ্যাবসলিউটলি’। সার্বিক ক্ষমতা সার্বিকভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। ইতঃপূর্বে আলোচনায় বারবারই ক্ষমতার প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। সুতরাং রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমরাহ, সামরিক অথবা বেসামরিক স্বৈরাচার যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সন্দেহাতীতভাবে রাজনৈতিক দুর্নীতিও সেখানে পরিপূর্ণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি অভিধা প্রচলিত- ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার’। তৃতীয় বিশ্বে অনেক দেশ রয়েছে, সেখানে গণতন্ত্র দৃশ্যমান এবং সংবিধান ও সরকারে গণতন্ত্রের লেবাস রয়েছে। কিন্তু অদৃশ্যমানভাবে স্বৈরতন্ত্রই প্রতিষ্ঠিত। সেখানে নির্বাচন একধরনের প্রহসন। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনকে নির্বাসন দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কলামিস্ট ফরিদ জাকারিয়ার কথিত ‘এক দিনের রাজাও’ আর জনগণ নেই। তৃতীয় বিশ্বে এসব গণতন্ত্রের অনেক বিশেষণ -পট গণতন্ত্র, অনুদার গণতন্ত্র, সর্বহারার গণতন্ত্র প্রভৃতি। এই সময়ে আমাদের ‘মূলমন্ত্র উন্নয়নের গণতন্ত্র’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, গণতন্ত্রের আগে-পিছে যখন কোনো নির্দেশক শব্দ বসছে তখনই বুঝতে হবে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। রাজনৈতিক দুর্নীতির অবসানে শুধু একটি মাত্র শব্দের উচ্চারণ- ‘গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র’। মনীষী টি এইচ বলেন, ‘ডেমোক্র্যাসি মে লুজ মেনি ব্যাটলস, বাট উইনস দ্য লাস্ট’। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *