ডেঙ্গু আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্যে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করুন

রুবেল আহমদ: মশা মারতে কামান দাগা নিয়ে রসাত্মক একটা উপমা আছে বাংলা সাহিত্যে। এটি এখন সত্য বাস্তব বাংলাদেশে। ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঢাকা জুড়ে মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি। উচ্চ আদালত এতে হস্তক্ষেপ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এসেছে। সেনাবাহিনী মশা মারতে শুরু করেছে সেনানিবাস এলাকাগুলোতে। সেনা প্রধান বলেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চাইলে সেনাবাহিনী ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং মশা মারতে আত্মনিয়োগ করবে। শরমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ নিয়ে মুখ খোলেননি। কারণ এ কেমন দেখায়! তিনি মন্ত্রী, তার তথা সিভিল প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকতে সেনাবাহিনী নামতে চাইছে। তবে সরকারের এক্ষেত্রে সাড়া দেয়া উচিত ছিল। আপনারা হাতিরঝিল বানানো সহ নানাকিছুতে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগান, জরুরি এ পরিস্থিতিতে শরম বড় হয়ে গেলো? তবে ঢাকার চলতি ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনীরও শরম পাওয়া উচিত। কারণ দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সেনাবাহিনীর পোশাক পরা দুই কর্মকর্তা। জেনারেল এরশাদ প্রশাসনের যে সামরিকায়ন করে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া-শেখ হাসিনা তাতে হাত দেননি। সে কারণে দেশের প্রধান নানা প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদেও সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা কী করেন ওখানে বসে? সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের দায়দায়িত্ব কী? মশামারা দুর্নীতির দায় কী তারা এড়াতে পারেন? এখন কী তারা চুপচাপ বসে নাটক দেখছেন? তারা কথা বলেননা বলে সফেদশুভ্র ? বলদ রাজনীতিকরাই শুধু মানুষের গালি খায়।

মানুষের ভোগান্তির আসল দিক এড়িয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো মেয়ররা যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে এরসঙ্গে গুজব তত্ত্বের সংযোগ খোঁজেন তখন বুঝতে হয় তারা ব্যর্থ এবং হতবিহবল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন বেকুব বাচাল বর্ণবাদীর মতো এডিস মশার সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জড়ান, এতে যে তার চাকরি নড়বড়ে হয় তা তিনি বোঝেননা? কারণ তাকে যিনি চাকরি দিয়েছেন মোহাম্মদ নাসিমের মতো একটিভ একজন মন্ত্রী বাদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেছেন, এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যে তিনি মাদার অব দ্য হিউম্যানিটি। আর এখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জড়ানোর কারণ কী? বাচ্চা বেশি পয়দা করে? রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আপনারা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পেয়েছেন-পাচ্ছেন, কিন্তু তাদের কী অন্য কাজ দিয়েছেন না অন্য কাজে ব্যস্ত করেছেন? যাদের কোন কাজ নেই তাদের স্ত্রী সঙ্গম আর বাচ্চা পয়দা করা ছাড়া আর কোন কাজ আছে কী? ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ, ডাক্তার-নার্স-হাসপাতাল কর্মী সবাইতো কাজ করছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও কাজ করছেন। কিন্তু ফাউল টক করলে যে এসব কাজ-পরিশ্রম সব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের না জানা একটা ঘটনা লিখছি। অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি দশ সপ্তাহ পরপর স্কুলগুলোতে দু’সপ্তাহের ছুটি থাকে। এই সময় অনেক অভিভাবক বাচ্চাদের নিয়ে ছুটি কাটাতে বিভিন্ন দিকে চলে যান। সিডনি প্রবাসী এক বাংলাদেশি কর্মজীবী মা এই সুযোগ দুই বাচ্চাকে নিয়ে গেলেন বাংলাদেশে। এখানে বাড়ি দেখাশোনা সহ নিজের চাকরির কারণে থেকে গেলেন বাচ্চাদের বাবা। প্রবাসীদের দেশে যাওয়া মানে যে কত আনন্দের তা শুধু প্রবাসীরা অনুভব করতে পারেন। এই মাও দেশে ফেরার খুশিতে দেশের নানাকিছুর ছবি পোষ্ট করেন ফেসবুকে। ফেসবুক লাইভে গিয়ে দেখান চেনাজানা পথগুলো নিয়ে তার আবেগ। বড় ছেলেটির বয়স পনের। সে আবার তার স্কুলের এক্সট্রা কারিকুলামের জন্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাতে চাইলে মা তাদের নিয়ে গেলেন কক্সবাজার। সেখান থেকে ফেরার পর ছোট ছেলেটির ডেঙ্গু ধরা পড়লে মাটি হয় পরিবারটির দেশে যাবার আনন্দ। স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ছোট ছেলেটিকে। বড় ছেলেটিকে গায়ে নারকেল তেল মাখিয়ে মশারির মধ্যে নানার বাসায় রাখা হয় এক রকম গৃহবন্দী করে।

দেশের সীমিত সামর্থ্যের যে সব মানুষ-পরিবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে তাদের অবস্থা কী? সিটি মেয়র-সরকার সবার বড়বড় কথা-গুজব এসব বাকোয়াজি করে পার পাবার সুযোগ নেই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর চিকিৎসার সমুদয় দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। কারণ এই দায় তাদের। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে দুই মেয়র এবং দায়িত্বশীলরা পেরেশান হবারও কিছু নেই। পেরেশান হয়ে সমাধান আসবেনা। যদি ঢাকা সিঙ্গাপুরের অবস্থায় থাকতো আর পরিস্থিতি হঠাৎ খারাপ হয়ে যেতো তাতে পেরেশানির ছিলো। বিদেশি নানা সূচকে ঢাকা এখন একটি বাস অযোগ্য শহর।

এখন আসল কথায় আসি। এডিস মশা-ডেঙ্গু মোকাবেলায় আপনারা ভবিষ্যতে কী করবেন না করবেন এসব ভবিষ্যতে করুন। এখন আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান। সরকারি বা বেসরকারি যে হাসপাতালেই হোকনা কেনো চিকিৎসার পুরো ব্যয় সিটি কর্পোরেশনকে দিতে হবে। কারণ এ পরিস্থিতির দায় তাদের। কর্পোরেশন যদি না দেয় সরকারকে তা আদায় করে দিতে হবে। আদায় না করতে পারলে দিতে হবে সরকারকে। আপাতত অন্তত রোগী প্রতি একটা থোক বরাদ্দের ঘোষণা দিন। আপনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেন, আগুনে পুড়ে মরলে বা সড়ক দুর্ঘটনায় মরলেওতো কুড়ি হাজার টাকা করে দেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত-ক্ষতিগ্রস্তদের দায়িত্ব নেবেননা কেনো? ভবিষ্যতে কত কোটি টাকার মশার ঔষধ কিনবেন কে কত টাকা মারবেন সেটা নিজেদের মধ্যে থাক। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে সব রোগীদের সরকারি খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা, সর্বস্বান্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ একজন এ নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন।

এভাবে একটা দায়বদ্ধতার নজির সৃষ্টি হোক। ডেঙ্গু আক্রান্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি জানাই। এই একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে রাষ্ট্রকে। যে রাষ্ট্র নিজের টাকায় পদ্মাসেতু বানায় সে রাষ্ট্রে এভাবে মনুষ্য সৃষ্ট পরিবেশের বলি হয়ে মানুষ মরবে কেনো?

লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *