জলবায়ু পরিবর্তন : বিপদে বাংলাদেশ

রুবেল আহমদ: জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্বে ও বাংলাদেশে। দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষসহ সব জীবের বাঁচার পরিবেশ। মানুষেরই কৃতকর্মে প্রকৃতি বিরূপ হয়ে উঠছে। বিশ্বের তাপমাত্রা এমনভাবে বাড়ছে, যাতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এবং তাদের বসতি ডুবে যাওয়ার ভয়ও বাড়ছে। বাংলাদেশে সিডর, আইলা, আমফান, প্লাবন, লবণাক্ততা ও খরার বাস্তবতায় এটি আর ভবিষ্যতের ভয় নয়; বিপদ এখন দোরগোড়ায়। কেবল মানবজাতিই নয়; পৃথিবীর সব প্রাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতি বছর জলবায়ু সম্মেলন হচ্ছে। প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৫ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে। মূল আয়োজক জাতিসঙ্ঘের অঙ্গ সংস্থা ইউএনএফসিসিসি। ১৯২টি সদস্য দেশ এতে অংশ নেয়। সর্বশেষ জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন কপ-২৫ অনুষ্ঠিত হয়েছিল স্পেনের মাদ্রিদ শহরে। ২০০টি দেশের অংশগ্রহণে দুই সপ্তাহব্যাপী এ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যোগ দেন।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৮ সাল থেকেই বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ড. সালিমুল হক বলেন, ‘‘এর আগে বহুদিন ধরে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে কিন্তু পাওয়া যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ‘প্যারিস চুক্তি’থেকে যুক্তরাষ্ট্র বের হয়ে যাবে’। ড. সালিমুল হক বলেন, তবে এর জন্য এক বছর সময় লাগে। এটি এখনো হয়নি। প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলেও জাতিসঙ্ঘের কনভেনশনের সাথে যুক্ত থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। এ দিকে ডেমোক্র্যাটরা বলছে, তারা ট্রাম্পকে পরাজিত করলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবার ফিরে আসবে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রতি বছরই কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস বা কপ আসে অনেক আশা-আকাক্সক্ষা আর স্বপ্ন নিয়ে। দুই সপ্তাহের দীর্ঘ আলোচনা তর্কবিতর্ক বাগি¦তণ্ডার পর দেখা যায় অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় আমাদের। কপ-২৫ খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর জন্য আরো বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আগামী বছর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার জন্য সম্মতির মধ্য দিয়ে সমাপ্তি টানা হলো কপ-২৫ এর। জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা যে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলছেন এবং দেশগুলো যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার মধ্যকার ব্যবধান তুলে ধরা হবে ২০২০ সালের কপ-২৬ এ।

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বিপদে চট্টগ্রাম, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং খুলনার কিছু অংশ। ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে। এতে ওই সময়ের হিসেবে ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ হবে ১৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগ ক্ষতির দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ১০টি জেলা। ১০টির মধ্যে সাতটি জেলা চট্টগ্রাম বিভাগে। ঝুঁকির তালিকায় ১০ জেলাগুলো হলো- কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, বরগুনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। বদলে গেছে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরনও।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবও বেড়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশে সমতল ও পাহাড়ি এলাকাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। এই সময়ের মধ্যে জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়াবে। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বুধবার বিশ্বব্যাংকের ‘দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু উপদ্রুত এলাকা (হটস্পট), জীবনমানের ওপরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে তার আর্থিক পরিমাণ ১৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের সাগরপাড়ের অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রভাবে হিমালয়বেষ্টিত পাহাড়ের বরফ গলবে।

এর পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর বরফ গলে তা সাগর-মহাসাগর অভিমুখে যখন আসবে তখন বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলগুলো ডুবে যাবে। সাগর ও মাহসাগরের পানির উচ্চতা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তখন বাংলাদেশের জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় দুই কোটি। তখন এই মানুষগুলো শহর অভিমুখে আসতে থাকবে। তখন সব ক’টি নগর অপরিচ্ছন্নতা নামক অসুখে ভুগবে। নগরে মানুষের চাপ ইতোমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। অপ্রিয় সত্য কথা এই যে, আমরা বেঁচে আছি শুধু প্রবাসীর আয়-রোজগারের টাকায়। প্রবাসীরা কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের টাকা পাঠানোর কারণে বাংলাদেশ বেঁচে গেছে। এই খাতটিতেই ইতোমধ্যে নানা বাধা-বিপত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে- তা যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় তাহলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। বাংলাদেশ যদি বহুমুখী রফতানি খাতগুলো জোরদার না করে তাহলে বিপদ দোরগোড়ায় আসতে সময় লাগবে না।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিপুল মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। এ সংখ্যা এরই মধ্যে কয়েক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জলবায়ুতে নেতিবাচক পরিবর্তনে ইতোমধ্যে যে দুর্যোগ দুর্বিপাকের সৃষ্টি হয়েছে তা ঠেকাতে বাংলাদেশ আগেভাগে লড়াই শুরু করেছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য সরকারিভাবে আশ্রয়ণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় উদ্যোগ।

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার মানুষের জীবনযাত্রার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। এর মূল কারণ- জেলাটি সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি। বেশি হুমকির মুখে রয়েছে এমন ১০টি জেলার মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম। এই শহরটিরও সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক কাছাকাছি। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এখানকার আর্থিক ক্ষতি অনেক বেশি হবে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতার পরিমাণও বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১০ শতাংশ। কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতাও এই বিভাগের মানুষের কম। বন ধ্বংস, জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া এখানকার অধিবাসীদের বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। এই বিভাগে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসও সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালে আইলা, ২০১২ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন এবং ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আমফানের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভাগটি। শিল্পের বিকাশ সাধন, যোগাযোগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিক থেকেও এই বিভাগ সবচেয়ে দুর্বল। এসব নানাবিধ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা এই বিভাগের কম। ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক জায়গায় থাকা সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকা শহরও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কম বিপদে নেই। এই শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে দুই হাজার ৩৩৮ জন মানুষ রাজধানীতে বাস করে। এই শহরে অবকাঠামোর পরিমাণও বেশি।

ঢাকা বিভাগের পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ নারীপ্রধান এবং কৃষির নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ২৯ শতাংশ। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানকার মানুষের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষমতা কম। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *