গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব

রুবেল আহমদ:পৃথিবীর যেকোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ উন্নয়ন অপরিহার্য। আর সব দেশেরই গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। প্রতিটি রাষ্ট্রই কৃষি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কৃষির উন্নয়ন প্রকারান্তরে কৃষকের উন্নয়ন। কৃষিভূমির প্রতিটি ইঞ্চিতে উন্নত বীজ ও সার ব্যবহারের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যে নিবিড় চাষাবাদ করা হয় তাকে কৃষি বিপ্লব বলা হয়। গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা শহরাঞ্চল থেকে ভিন্নতর হলেও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়াসহ প্রতিটি বাড়ির সাথে সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা গেলে তা উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের সহায়ক হয়। এর সাথে সাথে যেটি প্রয়োজন তা হলো স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিককরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭০ ভাগ গ্রামে ও ৩০ ভাগ শহরে বসবাস করে। প্রায় আড়াই যুগ আগে এ অনুপাতটি ছিল যথাক্রমে গ্রামে ৮০ ভাগ ও শহরে ২০ ভাগ। ১৯৪৭ সালে বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প কারখানা বলতে কিছুই ছিল না। গ্রামাঞ্চল দূরের কথা শহরাঞ্চলেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা ছিল না। শহরের প্রধান সড়ক ছাড়া অন্য সব সড়ক ছিল ইট বিছানো অথবা কাঁচা। শহরে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার সংখ্যা ছিল অতিনগণ্য।

পাকিস্তান শাসনামলের ২৩ বছরে সব শহরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা গেলেও গ্রামীণ জনপদের প্রায় শতভাগই ছিল বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা, সড়ক ও শিক্ষা সম্পর্কিত অবকাঠামো ছিল সামান্যই।

বাংলাদেশ অভ্যুদয় পরবর্তী দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। এখন গ্রামের পথঘাট অনেক উন্নত। এমন অনেক গ্রাম রয়েছে, যেগুলো পাকা রাস্তার মাধ্যমে শহরের সাথে সংযুক্ত। বর্তমানে গ্রামের প্রায় শতভাগ বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা আছে। বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অধিবাসীরা সৌরবিদ্যুতের বদৌলতে আধুনিক জীবনযাত্রার সব উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলে বায়োগ্যাসের মাধ্যমে রান্নার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের গৃহভিত্তিক প্রকল্প তিন দশকের অধিক সময় আগে যাত্রা শুরু করলেও এ ব্যাপারে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। অথচ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬-৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারের প্রতিদিন যে গৃহস্থালি বর্জ্য আবর্জনা ফেলে দেয়া হয়, তা একটি গরু ও বাছুরের গোবরের সাথে মিশ্রণ করে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করলে যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় এর মাধ্যমে এ ধরনের একটি পরিবারের ন্যূনতম জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ ধরনের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং বিভিন্ন এনজিও এগিয়ে এলেও প্ল্যান্ট স্থাপন বিষয়ে গ্রামের মানুষের আগ্রহ আশাপ্রদ নয়। এমনকি প্ল্যান্ট স্থাপন বিষয়ে ভর্র্তুকি দেয়ার কথা বলা হলেও দেখা গেছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সেগুলি গ্রামের মানুষের মধ্যে তেমন একটা উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারেনি।

বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা কারো মতে, ১৬ কোটির কাছাকাছি আবার কারো মতে ১৬ কোটির বেশি। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় কৃষিভূমির পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু উন্নত বীজ ও সার এবং বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারণে কৃষিজ প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন বেড়েছে।

আমাদের দেশে এখনো নগর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। যদিও আমাদের সংবিধানে এ বৈষম্য দূর করার জন্য কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিককরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের ওপর সমধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে সরকারি বেতনভুক যেসব ব্যক্তি জড়িত তাদের কর্মের প্রতি অনীহা, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা ও বিশ্বস্ততার অভাব প্রভৃতি এ বিষয়ক সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমকেই বাধাগ্রস্ত করে চলেছে।

বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী প্রতিটি সরকারই গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লবের লক্ষ্যে বার্ষিক রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট প্রণয়নকালে যথাযথ বরাদ্দ দিতে সচেষ্ট থেকেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বিরাট অংশ জনপ্রতিনিধি ও সরকারি ব্যক্তিরা লুণ্ঠন করায় তা কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখতে পারেনি। আর এ কারণেই আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব দীর্ঘদিন ধরে একটি আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলে কৃষির পাশাপাশি সমভাবে কুটির শিল্প স্থাপন ও অন্যান্য শিল্প কারখানার বিকাশ সাধন করা গেলে গ্রামের মানুষ জীবিকা ও বাড়তি আয়ের অন্বেষণে শহরমুখী হবে না। এ যাবৎকাল পর্যন্ত এ পথে আমাদের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। আমাদের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লবকে যে অর্থে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে, আমরা প্রকৃত অর্থেই এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ মৌলনীতিটির সার্থক বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতে পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নসহ কৃষকের জীবনযাপন মানে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *