ক্রসফায়ার এর নীলনকশা


রুবেল আহমদ:: বাংলাদেশে র্যা ব- এর কর্মকান্ডেনানাভাবে সমালোচিত এই বাহিনী। এমনকি এটা বিলুপ্ত করার পক্ষে বিপক্ষে চলছে নানা বিতর্ক। র্যা ব কী বিলুপ্ত করা দরকার? নাকি প্রয়োজন এর সংস্কার? এ নিয়ে এখন দেশে-বিদেশে চলছে নানা তর্ক। একের পর এক বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড করার পরও একটি হত্যাকান্ডেরও বিচার হয়নি এখনো।

ব্যাপক বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগ থাকা ‘এলিট বাহিনী’ র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব) ভেঙে দিয়ে একটি নতুন ‘বেসামরিক’ বাহিনী গড়ে তোলার সুপারিশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। চলতি বছরের (২০১২) সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করা হয়।

অবশ্য, এই প্রতিবেদনকে অবশ্য ‘আন্তজার্তিক ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের’ ও ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও কল্পণাপ্রসূত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. মাহফুজুল হক স্বাক্ষরিত ‘প্রতিবাদলিপিতে’ বলা হয়, “সরকার মনে করে এ ধরনের অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তজার্তিক ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের অংশ। সরকার আশা করে যে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদন ও বক্তব্য প্রত্যাহার করবে ….”।

বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগে সাজা দেয়া হয়নি র্যা ব এর একজন সদস্যকেও। বরঞ্চ রাষ্ট্রের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ই বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষ নেয়া হয়েছে। বিএনপির বা আওয়ামী লীগ দু’ আমলেই এসব হত্যাকান্ডের সাফাই গেয়েছেন প্রধান দল দুটির প্রভাবশালী বেশ ক’জন মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল ইসলাম টুকুতো সবসময়ই ক্রসফায়ার এর পক্ষে বেশ জোরেশোরে বক্তব্য রেখেছেন। যদিও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আইনজীবী আর মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, সংবিধানেরও অবমাননা করা হচ্ছে এসব হত্যাকান্ডের মাধ্যমে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অভিযোগের মুখে থাকা র্যা ব এর প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তা বন্ধ করার জন্য এই সংস্থাটি (এইচআরডব্লিউ) ২০১০ সালের ২৩শে ডিসেম্বর দাবি জানায়। ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদনেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্য র্যা ব দায়ী করে প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি।

সেসময় বার্তাসংস্থা এপিকে সংস্থাটির দক্ষিণ এশীয় পরিচালক মিনাক্ষী গঙ্গোপাধ্যায় এক ই-মেইলে বলেন, “মৌলিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো দেশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারে না।” “কিন্তু অপরাধীদের কর্মকান্ড বন্ধ করার জন্য তাদের তুলে নিয়ে হত্যা নয়, তাদের ধরে বিচার করে শাস্তি দিতে হবে।”

মিনাক্ষী বলেন, “র্যা ব এর সংস্কারে শিগগিরই কোনো উদ্যোগ দেখা না গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য র্যা ব এর প্রশিক্ষণ সহায়তা বন্ধ করা উচিৎ। একইসঙ্গে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে র্যা বের ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাংলাদেশে আইনের কার্যকরিতার জন্য ক্ষতিকারক।

মিনাক্ষী প্রশ্ন করেন, “বাহিনীটি যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, কারণ এটি জানে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করলেও রাষ্ট্রই একে রক্ষা করবে। বাংলাদেশ কি আসলেই এমন একটি বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে চায়?”

বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এখন এমন এক পর্যায়ে ঠেকেছে যে র্যাবকে সব ধরণের প্রশিক্ষণ বন্ধ করারও দাবি উঠেছে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধ/এনকাউন্টার’র মাধ্যমে বিচার বহির্ভূতভাবে হাজারেরও বেশি মানুষ ‘হত্যা’র অভিযোগ রয়েছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত যেমন রয়েছে, তেমনি নিরাপরাধ লোকও রয়েছে বলে অভিযোগ। যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদশের সরকারের সংবিধানেরও সুস্পষ্ট লংঘন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল-৩১ এ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আর্টিকেল-৩২ এ ব্যক্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার এবং আর্টিকেল-৩৩ এ গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ এর কথা বলা হয়েছে।আর আর্টিকেল-৩৫ এ বিচার ও দন্ড সম্পর্কে রক্ষণ এর কথা রয়েছে।

২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর লুতফর খালাসী এবং তার ভাই খায়রুল খালাসীকে ধরে নিয়ে যায় র্যা ব সদস্যরা। লুৎফরের স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং তার ছেলে বাবলু মাদারীপুরে একই দিন সাংবাদিক সম্মেলন করেন র্যা ব এর কাছে অনুরোধ করেন, তাদেরকে যাতে ‘ক্রসফায়ার’ এ না মারা হয় সেজন্য । সাংবাদিক সম্মেলনের ৩৬ ঘন্টা পর, ১৬ই নভেম্বর দুই ভাইকে ‘ক্রসফায়ার’ হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় হাইকোর্ট এর বিচারপতি এ এফএম আবদুর রহমান এবং বিচারপতি মো. এমদাদুল হক আজাদ এর বেঞ্চ স্বতপ্রোনোদিত হয়ে ১৭ই নভেম্বর সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয় বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ডকে কেনো অবৈধ করা হবে না। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জবাব চাওয়া হয়।

র্যা ব প্রতিষ্ঠার পর ক্রসফায়ারে সারা দেশে ১৪৬২ জন নিহত হবার বিষয়টিও আদালতের নজরে আসে। এর মধ্যে ২০০৪ সালে ২৪০ জন, ২০০৫ সালে ৩৯৬ জন, ২০০৬ সালে ৩৫৫ জন, ২০০৭ সালে ৩৫৫ জন, ২০০৮ সালে ১৪৯ এবং ২০০৯ সালে ১৩৮ জন। এর আগে ২০০৬ সালে এবং ২০০৯ সালের জুন মাসেও হাইকোর্ট রুল জারি করে। লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *